মাছি মারতে হাতুড়ি নয়! দিল্লি পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্টের বড় মন্তব্য।

 Delhi Jantar Mantar News :দিল্লির যন্তর মন্তরে শনিবারের প্রস্তাবিত বিক্ষোভ কর্মসূচিকে ঘিরে উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। তাদের প্রস্তাবিত ‘যন্তর মন্তর ২.০’ কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষকে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে দিল্লি পুলিশ স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এই কর্মসূচির জন্য অনুমতি দেওয়া হয়নি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাজধানীজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে।

শনিবারের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে যন্তর মন্তর এবং তার আশপাশের এলাকায় কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে দিল্লি পুলিশ। আন্দোলনস্থল ও সংলগ্ন এলাকায় নজরদারি বাড়াতে বসানো হয়েছে ৩০০-র বেশি সিসি ক্যামেরা। পাশাপাশি, বিভিন্ন জায়গায় ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছে এবং অতিরিক্ত পুলিশকর্মী মোতায়েনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

পুলিশ সূত্রে খবর, যন্তর মন্তর ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তার দায়িত্বে ২০ হাজারের বেশি কর্মী মোতায়েন থাকার কথা। পরিস্থিতি সামাল দিতে ১২টি ডিটেনশন সেন্টারও তৈরি করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

প্রশাসনের তরফে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল। শুক্রবার রাত ১০টা থেকে শনিবার রাত ১০টা পর্যন্ত পরিষেবা বন্ধ রাখার পরিকল্পনার কথা সামনে আসে। এই সিদ্ধান্তে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সম্মতি ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দিল্লি পুলিশ আগেই জানিয়েছিল, যন্তর মন্তরে শনিবারের বিক্ষোভ কর্মসূচির অনুমতি দেওয়া হয়নি। শুক্রবার রাতেও একই অবস্থান জানিয়ে বিবৃতি দেয় পুলিশ। অনুমতি না দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পুলিশ অতীতের একটি আন্দোলনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছে।

পুলিশের বক্তব্য, সিজেপির একটি নিট-সংক্রান্ত প্রতিবাদ কর্মসূচির জন্য এক দিনের অনুমতি দেওয়া হলেও সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে জমায়েত চলেছিল। ওই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে অশান্তি ও সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে পুলিশের দাবি। সেই ঘটনায় একাধিক পুলিশকর্মী আহত হন এবং কয়েক জন শিক্ষার্থীও জখম হন বলে জানানো হয়েছে। আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই এবার অনুমতি দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।

অন্যদিকে, আন্দোলনকারীদের একাংশের অভিযোগ, শনিবারের কর্মসূচি শুরু হওয়ার আগেই তা আটকানোর চেষ্টা চলছে। পশ্চিমবঙ্গ-সহ দেশের বিভিন্ন রাজ্য থেকে যাঁরা দিল্লিতে আসতে চাইছেন, তাঁদের যাতায়াত ব্যাহত করতে রেল, পুলিশ ও প্রশাসনকে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে দাবি তাঁদের।

অভিযোগ অনুযায়ী, হাওড়া ও শিয়ালদহ থেকে দিল্লিগামী রাজধানী এক্সপ্রেস বাতিল করা হয়েছে। এ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিনগামী কিছু দূরপাল্লার ট্রেনের যাত্রাপথ পরিবর্তন এবং কিছু ট্রেন বাতিলের অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি, কয়েকটি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে ট্রেন বাতিল, যাত্রাপথ পরিবর্তন এবং মেট্রো পরিষেবা সংক্রান্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিজ্ঞপ্তি থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।

দিল্লি পুলিশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং গণপরিবহণে বিধিনিষেধের বিষয়টি শুক্রবার সুপ্রিম কোর্টে উত্থাপিত হয়। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এ বিষয়ে পর্যবেক্ষণ জানায়। শীর্ষ আদালতের বক্তব্যের মূল কথা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি হলেও তার জন্য সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক যাতায়াতের অধিকার পুরোপুরি খর্ব করা যায় না।

আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে প্রতিদিন বহু মানুষ যাতায়াত করেন। তাঁদের প্রয়োজন ও অসুবিধার কথাও প্রশাসনকে বিবেচনা করতে হবে। নিরাপত্তার অজুহাতে যাত্রীদের প্রয়োজনীয় পরিষেবা থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয় বলেও জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার মেট্রো ও ট্রেন পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করা যাবে না বলে নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। আদালত জানিয়েছে, মেট্রোর সংখ্যা কমানোর মতো বিকল্প বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে দিল্লির যে রাস্তাগুলি বন্ধ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে, সেগুলিও পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে, ভোটচুরির অভিযোগ এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিকে সামনে রেখে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে দেখা করেছে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’-র প্রতিনিধিদল।

শুক্রবার প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চলে এই বৈঠক। বৈঠক শেষে বিরোধী নেতারা জানান, রাষ্ট্রপতি তাঁদের বক্তব্য মন দিয়ে শুনেছেন এবং অভিযোগের সমর্থনে প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণ জমা দিতে বলেছেন।

বিরোধীদের দাবি, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে বিস্তারিত বক্তব্য তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি, জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা-সহ একাধিক দাবিতে স্মারকলিপিও জমা দেওয়া হয়েছে।

বৈঠক শেষে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, রাষ্ট্রপতির মনোভাব তাঁদের কাছে ইতিবাচক বলে মনে হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি বিষয়টি আরও বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছেন। তবে তার জন্য প্রয়োজনীয় নথি ও তথ্যপ্রমাণ জমা দিতে হবে।

কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীও বৈঠক নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন। বিরোধী নেতাদের বক্তব্য, তাঁদের অভিযোগের গুরুত্ব রাষ্ট্রপতির কাছে তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে। তবে বিরোধীদের তোলা ভোটচুরির অভিযোগ এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনও হয়নি।

যন্তর মন্তরে প্রস্তাবিত বিক্ষোভ, দিল্লি পুলিশের কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা, গণপরিবহণ নিয়ে বিতর্ক এবং সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ— সব মিলিয়ে শনিবার রাজধানীর পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একদিকে প্রশাসনের সামনে নিরাপত্তা বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের প্রতিবাদ জানানোর দাবি। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের যাতায়াত যাতে অকারণে ব্যাহত না হয়, তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

এখন দেখার, দিল্লির পরিস্থিতি কোন দিকে এগোয় এবং আন্দোলন ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে প্রশাসন কী পদক্ষেপ করে।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url
×
↑