স্টারলিঙ্ক বিতর্কে ইলন মাস্কের পাশে রাহুল গান্ধী, বিজেপির নিশানায় কংগ্রেস।

 ভারতের বাজারে ব্যবসা শুরু করার চেষ্টা দীর্ঘদিনের। কিন্তু এখনও প্রয়োজনীয় অনুমোদন না মেলায় ভারতে স্টারলিঙ্কের পরিষেবা চালু করতে পারেনি ইলন মাস্কের সংস্থা। এই পরিস্থিতিতে ভারতীয় বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মাস্ক। তাঁর বক্তব্যকে সমর্থন করে সরব হয়েছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীও। আর তা নিয়েই শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক। প্রশ্ন উঠছে, মাস্কের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে কি বিজেপির হাতে নতুন রাজনৈতিক অস্ত্র তুলে দিলেন কংগ্রেস নেতা?

বৃহস্পতিবার ভারতের বাজারে ব্যবসা করার ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ তুলেছিলেন আমেরিকান ধনকুবের ইলন মাস্ক। তাঁর দাবি, কিছু প্রভাবশালী শিল্পপতি স্টারলিঙ্কের ভারতে প্রবেশের পথে বাধা তৈরি করছেন। মাস্কের এই মন্তব্যের পরেই তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে পোস্ট করেন রাহুল গান্ধী। শুক্রবারও ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে সমান সুযোগের দাবি তুলে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন তিনি।

স্টারলিঙ্ক বিতর্কে ইলন মাস্কের পাশে রাহুল গান্ধী, বিজেপির নিশানায় কংগ্রেস।

রাহুলের বক্তব্য, তিনি কখনওই ব্যবসার বিরোধী নন। তবে কোনও সংস্থা বা ব্যবসায়ীর হাতে বাজারের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ চলে যাক, তা তিনি চান না। কংগ্রেসের তরফেও এই বক্তব্য সামনে আনা হয়েছে। দলের প্রকাশিত একটি ভিডিয়োতে রাহুলকে কর্পোরেট আধিপত্য এবং দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়ে নিজের মতামত তুলে ধরতে দেখা যায়। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর, ব্যবসার সুযোগ সবার জন্য সমান হওয়া উচিত।

প্রসঙ্গত, ইলন মাস্কের সংস্থা স্টারলিঙ্ক দীর্ঘদিন ধরেই ভারতে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবা চালু করার চেষ্টা করছে। তবে প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন ও লাইসেন্স সংক্রান্ত প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হওয়ায় এখনও পরিষেবা চালু করা সম্ভব হয়নি। এই পরিস্থিতিতে মাস্কের অভিযোগ, ভারতের কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে স্টারলিঙ্কের প্রবেশে বাধা দিচ্ছেন।

মাস্কের এই মন্তব্যের পর রাহুল গান্ধী তাঁর পোস্ট শেয়ার করে লেখেন, ‘ভারতে স্বাগত ইলন। অন্য জনকে আবিষ্কার না করা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।’ রাহুলের এই মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের মতে, তাঁর ইঙ্গিত ছিল দেশের কয়েক জন প্রভাবশালী শিল্পপতির দিকে। বিশেষ করে গৌতম আদানিকে নিশানা করেই তিনি এই মন্তব্য করেছেন কি না, তা নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে, মাস্ক সরাসরি রিলায়্যান্স ইন্ডাস্ট্রিজের কর্ণধার মুকেশ অম্বানীর নাম উল্লেখ করে পোস্ট করেছিলেন। পরে সেই পোস্টও শেয়ার করেন রাহুল। তবে স্টারলিঙ্কের পাশাপাশি অম্বানীর জিও-র স্যাটেলাইট পরিষেবার ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ছাড়পত্র ও চূড়ান্ত অনুমোদনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই বিতর্ক শুধু দুই শিল্পপতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে দেশের টেলিকম নীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নও।

রাহুলের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিজেপি। গেরুয়া শিবিরের বক্তব্য, জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করেই স্যাটেলাইট যোগাযোগ পরিষেবার অনুমোদন দেওয়া হয়। তাই প্রয়োজনীয় অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত স্টারলিঙ্কের পরিষেবা চালু না হওয়াকে শুধুমাত্র ব্যবসায়িক বৈষম্য হিসেবে দেখা যায় না। বিজেপির প্রশ্ন, দেশের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়টি সামনে থাকা সত্ত্বেও কেন রাহুল গান্ধী মাস্কের বক্তব্যকে সমর্থন করছেন?

এদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে আন্দোলন এবং ভোটচুরির অভিযোগ নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছেন রাহুল গান্ধী। বিরোধীদের এই আন্দোলন ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক চাপানউতর চলছে। এমন পরিস্থিতিতে মাস্কের পাশে দাঁড়ানো নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হওয়ায় কংগ্রেসের রাজনৈতিক অবস্থান কতটা সুবিধাজনক থাকছে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, ভোটচুরি এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিরোধীদের আন্দোলন যখন গতি পাচ্ছে, তখন স্টারলিঙ্ক বিতর্কে রাহুলের অবস্থান বিজেপিকে পাল্টা আক্রমণের সুযোগ করে দিতে পারে। যদিও রাহুলের বক্তব্যের মূল বিষয় হল ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে সমান সুযোগ এবং একচেটিয়া আধিপত্যের বিরোধিতা। তাঁর সমর্থকদের মতে, এই অবস্থানকে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়।

এর আগে স্টারলিঙ্কের সঙ্গে এয়ারটেল ও জিও-র অংশীদারি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন কংগ্রেসের মুখপাত্র তথা সাংসদ জয়রাম রমেশ। তাঁর অভিযোগ ছিল, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে ভালো বার্তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই চুক্তিগুলিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। সেই অবস্থানের পরেই মাস্ককে রাহুলের সমর্থন ঘিরে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে।

কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য শিন্ডে এই বিষয়টি নিয়ে কংগ্রেসকে কটাক্ষ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, স্টারলিঙ্কের লাইসেন্স নিয়ে প্রথমে আপত্তি তোলা হয়েছিল, অথচ এখন সেই সংস্থার অনুমোদন না পাওয়া নিয়েই প্রশ্ন তুলছে বিরোধীরা। বিজেপির মুখপাত্র প্রদীপ ভান্ডারিও রাহুল গান্ধীর সমালোচনা করে দাবি করেছেন, জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কংগ্রেস বারবার বিরোধিতার পথ বেছে নিচ্ছে।

সব মিলিয়ে স্টারলিঙ্কের ভারতে প্রবেশ নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক এখন ব্যবসার গণ্ডি ছাড়িয়ে রাজনৈতিক লড়াইয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। একদিকে রয়েছে সমান ব্যবসায়িক সুযোগের দাবি, অন্যদিকে জাতীয় নিরাপত্তা ও সরকারি অনুমোদনের প্রশ্ন। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা হবে, সেটাই এখন আলোচনার কেন্দ্রে। পাশাপাশি, মাস্কের বক্তব্যকে সমর্থন করে রাহুল গান্ধী রাজনৈতিকভাবে কতটা লাভবান হবেন, নাকি বিজেপি এই বিতর্ককে হাতিয়ার করে পাল্টা আক্রমণ আরও জোরদার করবে, তা দেখার বিষয়।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url
×
↑