স্টক মার্কেট কী? কীভাবে কাজ করে, কেন শেয়ার কেনাবেচা হয়।

স্টক মার্কেটের কথা শুনলেই অনেকের মনে হয়, এটি হয়তো খুব জটিল কোনও বিষয়। কিন্তু সহজভাবে বুঝতে গেলে বিষয়টি আসলে ততটা কঠিন নয়। স্টক মার্কেট হল এমন একটি বাজার, যেখানে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার কেনা-বেচা হয়।

একটি কোম্পানির শেয়ার কেনার অর্থ হল সেই কোম্পানির খুব ছোট একটি অংশের মালিক হয়ে যাওয়া। ধরুন, কোনও কোম্পানি মোট ১,০০০টি শেয়ারে ভাগ করা রয়েছে। আপনি তার মধ্যে ১টি শেয়ার কিনলেন। তাহলে ওই কোম্পানির ১,০০০ ভাগের ১ ভাগের মালিকানা আপনার হাতে এল।

স্টক মার্কেট কী এবং কীভাবে কাজ করে

অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে একজন বিনিয়োগকারী শুধু একটি শেয়ারই কিনতে পারবেন। নিজের সামর্থ্য ও বিনিয়োগের পরিকল্পনা অনুযায়ী একজন ব্যক্তি একাধিক শেয়ার কিনতে বা বিক্রি করতে পারেন।

শেয়ারের দাম কেন ওঠানামা করে?

স্টক মার্কেটে শেয়ারের দাম মূলত ক্রেতা ও বিক্রেতার চাহিদা-জোগানের ওপর নির্ভর করে। কোনও কোম্পানির ব্যবসা ভালো চলছে, লাভ বাড়ছে বা ভবিষ্যৎ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আশা তৈরি হচ্ছে—তাহলে সেই কোম্পানির শেয়ারের চাহিদা বাড়তে পারে। ফলে দামও বাড়তে পারে।

আবার কোম্পানির ব্যবসায় সমস্যা দেখা দিলে, লাভ কমে গেলে বা বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে গেলে শেয়ারের চাহিদা কমতে পারে এবং দামও পড়ে যেতে পারে।

তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—কোম্পানি লাভ করলেই যে তার শেয়ারের দাম অবশ্যই বাড়বে, এমন নয়। বাজারে আরও অনেক বিষয় শেয়ারের দামের ওপর প্রভাব ফেলে। ওয়ারেন বাফেটের বিখ্যাত বক্তব্য:-“Price is what you pay. Value is what you get.”

অর্থাৎ, কোনও শেয়ারের জন্য আপনি কত টাকা দিচ্ছেন সেটি এক বিষয়, আর সেই শেয়ারের প্রকৃত মূল্য কত সেটি সম্পূর্ণ অন্য বিষয়।

কোম্পানিগুলি কেন স্টক মার্কেট থেকে টাকা তোলে?

একটি কোম্পানির ব্যবসা বড় করতে গেলে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। নতুন কারখানা তৈরি, ব্যবসা সম্প্রসারণ, নতুন পণ্য বা পরিষেবা চালু করা, প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ কিংবা পুরনো ঋণ পরিশোধ—বিভিন্ন কারণে কোম্পানির অতিরিক্ত মূলধনের প্রয়োজন হয়।

এই অর্থ সংগ্রহের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হল শেয়ার বিক্রি করা।

কোম্পানি যখন বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ার বিক্রি করে, তখন বিনিয়োগকারীরা অর্থের বিনিময়ে কোম্পানির একটি ছোট অংশের মালিকানা পান। আর কোম্পানি সেই অর্থ ব্যবসার প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করতে পারে।

ঋণ নেওয়ার সঙ্গে এর একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। ঋণ নিলে সাধারণত সুদ দিতে হয় এবং নির্দিষ্ট সময়ের পরে টাকা ফেরত দিতে হয়। কিন্তু ইক্যুইটি বা শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে সংগ্রহ করা মূলধনের ক্ষেত্রে সেই একই ধরনের ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা থাকে না।

তবে এর বিনিময়ে কোম্পানির মালিকানার একটি অংশ অন্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়।

বিনিয়োগকারীরা কীভাবে লাভ করেন?

কোনও বিনিয়োগকারী একটি কোম্পানির শেয়ার কিনলে তার লাভের প্রধান দুটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে।

প্রথমত, শেয়ারের দাম বাড়লে।
ধরুন, আপনি ১০০ টাকা দামে একটি শেয়ার কিনলেন। পরে সেটির বাজারমূল্য ১৩০ টাকা হল। তাহলে শেয়ারটি বিক্রি করলে খরচ বাদ দেওয়ার আগে আপনার ৩০ টাকা মূলধনী লাভ হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, ডিভিডেন্ডের মাধ্যমে।
কিছু কোম্পানি তাদের লাভের একটি অংশ শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে ডিভিডেন্ড হিসেবে বিতরণ করে। তবে সব কোম্পানি নিয়মিত ডিভিডেন্ড দেয় না।

এখানেই বিনিয়োগের ঝুঁকির বিষয়টি আসে। শেয়ারের দাম যেমন বাড়তে পারে, তেমনই কমেও যেতে পারে। তাই স্টক মার্কেটে বিনিয়োগ মানেই নিশ্চিত লাভ নয়।পিটার লিঞ্চের একটি বহুল উদ্ধৃত বক্তব্য:-“Know what you own, and know why you own it.”

অর্থাৎ, আপনি যে কোম্পানিতে বিনিয়োগ করছেন সেটি কী এবং কেন সেই কোম্পানির শেয়ার কিনছেন—সেটা বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

IPO কী?

কোনও কোম্পানি যখন প্রথমবার সাধারণ মানুষের কাছে শেয়ার বিক্রি করে এবং শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য যায়, সেই প্রক্রিয়াকে বলা হয় Initial Public Offering বা IPO।

সহজভাবে বললে, কোনও বেসরকারি কোম্পানি যখন প্রথমবার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য নিজের শেয়ারের একটি অংশ উন্মুক্ত করে, তখন সেটি IPO-এর মাধ্যমে করতে পারে।

IPO-এর মাধ্যমে কোম্পানি ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য নতুন মূলধন সংগ্রহ করতে পারে। অন্যদিকে সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও কোম্পানির অংশীদার হওয়ার সুযোগ পান।

চাহিদা ও জোগানের প্রভাব

স্টক মার্কেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির মধ্যে একটি হল চাহিদা ও জোগান।

কোনও শেয়ারের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বেড়ে গেলে এবং বিক্রেতার সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলে শেয়ারের দাম বাড়ার প্রবণতা দেখা যায়। আবার বিক্রির চাপ বেশি হলে এবং ক্রেতার আগ্রহ কমে গেলে দাম কমতে পারে।

তবে বাস্তবে শেয়ারের দাম শুধু চাহিদা-জোগানের সাধারণ হিসাবেই নির্ধারিত হয় না। কোম্পানির আর্থিক ফলাফল, অর্থনীতি, সুদের হার, শিল্পের পরিস্থিতি, খবর, বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা এবং সামগ্রিক বাজারের পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

স্টক মার্কেট কি নিরাপদ?

স্টক মার্কেট একটি নিয়ন্ত্রিত আর্থিক বাজারব্যবস্থার অংশ। এখানে নির্দিষ্ট নিয়ম ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাঠামোর মধ্যে শেয়ার কেনাবেচা হয়।

কিন্তু নিয়ন্ত্রিত বাজার মানেই বিনিয়োগে কোনও ঝুঁকি নেই—এমন নয়। শেয়ারের বাজারমূল্য কমে গেলে বিনিয়োগকারীর ক্ষতি হতে পারে।

তাই কোনও কোম্পানির শেয়ার কেনার আগে কোম্পানির ব্যবসা, আর্থিক ফলাফল, ঋণ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং ঝুঁকি সম্পর্কে যথাসম্ভব তথ্য জানা গুরুত্বপূর্ণ। চার্লি মাঙ্গারের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা:-“The big money is not in the buying or selling, but in the waiting.”

অর্থাৎ, শুধু কখন শেয়ার কিনবেন বা বিক্রি করবেন সেটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়; ভালো বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ধৈর্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

এক কথায় স্টক মার্কেট

সহজ ভাষায়, স্টক মার্কেট হল এমন একটি বাজার যেখানে কোম্পানির মালিকানার ছোট ছোট অংশ বা শেয়ার কেনাবেচা হয়।

কোম্পানিগুলি শেয়ার বিক্রি করে ব্যবসার জন্য মূলধন সংগ্রহ করতে পারে, আর বিনিয়োগকারীরা সেই কোম্পানির অংশীদার হয়ে ভবিষ্যতে শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধি বা ডিভিডেন্ডের মাধ্যমে লাভের সুযোগ পান।

তবে লাভের পাশাপাশি ক্ষতির সম্ভাবনাও রয়েছে। তাই স্টক মার্কেটে বিনিয়োগ করার আগে শুধু অন্যের কথায় নয়, নিজের গবেষণা ও ঝুঁকি বোঝার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url
×
↑